শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
চন্দ্রের জ্যোৎস্নাবিলাস

চন্দ্রের জ্যোৎস্নাবিলাস

ফেরদৌসী মজুমদার।।

সন্ধ্যার ছায়া নেমেছে অনেকক্ষণ। তারারা ফুটতে শুরু করেছে। চন্দনার মনে হচ্ছে চন্দ্র-সূর্য -আকাশ -চরাচর সহস্র কবিতার সংগ্রহ। অলস দুপুরে যে ক’পংতি কবিতা লিখেছিল, সেগুলো সন্ধ্যায় নির্মল আকাশ তলে বসে শত পংতি হয়ে তাকে ক্ষণে হাস্যোজ্জ্বল ক্ষণে অশ্রু ভারাক্রান্ত করে তুলছে।
ঘরে বাতি জ্বালানোর কথা মনে পড়ে না। তাকে ডেকে নেবার কোথাও কেউ নেই ।

জলযোগের সময় সঞ্জয়কে একনজর দেখেছিলো চন্দনা। সুন্দর সুপুরুষ তবে বড্ড ক্লান্ত -অবসন্ন আর ফ্যাকাশে। ধুতি -পাঞ্জাবিতে বিয়ের বর মনে হচ্ছিলো। চন্দনার মা মেয়েকে সাধ্যমত সাজিয়ে দিয়েছেন। শ্বশুর আশীর্বাদ করলেন ১০ ভরি ওজনের সোনার মোহর দিয়ে। বংশ রক্ষার্থে জমিদারবাবু প্রতারণার আশ্রয় নিলেন।ক্যান্সারাক্রান্ত ছেলেকে গরিব ঘরে বিয়ে করিয়ে তিনি আর দেরি করলেন না।

পথের ধারে ফুটে আছে ঘাসফুল। দূরে দূরে শাল- শিমুল,রক্তপলাশ রং ছড়িয়ে আছে আকাশ আলো করে। সারাপথ শ্বশুরমশাই চন্দনাকে তার ভবিষ্যৎ সংসারের দিকনির্দেশনা দিয়ে চলেছেন। কিন্তু সে সমস্ত উপদেশ চন্দনার কানে কতটা পৌঁছেছে বলা মুশকিল। তার চোখ জুড়ে আজন্মের দেখা বাগানবাড়ি , ফুলের সুগন্ধে ভরা বন ক্ষণে ক্ষণে তাকে উন্মনা করে তুললো। মা বাবার কথা মনে করে দুচোখ প্লাবিত হল কতবার। একমাত্র ভাই সৌমেন আসার সময় চিৎকার করে জড়িয়ে ধরেছিল, সে কথা স্মরণ করে ফুঁপিয়ে উঠলো কতবার। ঝাপসা চোখের পর্দায় অভিমানী রাজদার মুখ তাকে বেসামাল করে তুললো।

বাড়ি ঢুকলো তাদের গাড়ি। চন্দনা বুঝলো শাশুড়ি বিহীন বাড়িতে নির্দেশের অভাবে চাকর বাকরেরা দিশেহারা হয়ে উঠেছে । সঞ্জয়কে খুব তৎপর হয়ে উঠতে দেখা গেল। গাড়ি থেকে নেমে দুহাত বাড়িয়ে দিল চন্দনার দিকে। চন্দনাও হাতদুটিকে নির্ভর করে নেমে এলো। শঙ্খ বেজে উঠলো, সঙ্গে উলুধ্বনি। এতক্ষণে কারা যেন একটা ছোট্ট মিছিলের আদলে এগিয়ে এসে বর-বধুকে বরণ করে নিল।
চন্দনার বর সঞ্জয় দু’মাস হলো মারা গেছে । শ্বশুরের সম্মতিতে চন্দনা নিজের বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। তার বিয়ের দুবছর পর বাবা ভারতে জেঠুর কাছে চলে গেছেন। মা-বাবা ততদিনে সঞ্জয়ের জীবনঘাতি রোগের কথা জেনে চন্দনার কথা ভেবে বাড়ি আর বাগান বিক্রির কথা মনে আনেননি।

শ্বশুরের সাথে চন্দনা ঘোড়ার গাড়িতে। আজ প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শ্বশুরমশাই সংসারের যাবতীয় গরুর গাড়িতে তুলে দিয়েছেন । ফিরে তাকালো —পুরো দালানটা চোখের সীমায়। প্রায় ছ’বছর কেটেছে এখানে। খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিল ছাদটা। সঞ্জয়কে নিয়ে পূর্ণিমা তিথিতে উঠেছিল মাত্র দু’বার । একটু কোথায় যেন চিনচিন করছে । এটা কি মায়া ? স্টেশন খুব দূরে নয়। সিগন্যাল মিলিয়ে যেতেই গাড়ির গতি বাড়লো। হু হু করে ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে ট্রেন , তার চেয়ে দ্রুত গতিতে চন্দনার মন। কোন মুখে আজ দাঁড়াবে রাজের সামনে৷? সেদিন কেমন তাড়াহুড়ো করে সব হয়ে গেলো ! রাজ বাড়ি থাকলে কি ঠেকাতে পারতো ? এতোগুলো বছরে একবার দেখতেও এলো না ! অথচ তাকেই কিনা নির্দ্বিধায় চন্দনা লিখলো,”বাড়ি-ঘর গুছিয়ে রেখো রাজদা, আমি আসছি তোমার কাছে।”
বাবার চিঠিতে জেনেছে রাজের বিয়ের আর অন্তুর জন্মানোর কথা। রাজ যদি সংসারী হতে পারে তবে চন্দনার কুমারীত্বের কথা বিশ্বাস করাতে বয়েই গেছে । পুতুল কি চন্দনাকে সহজভাবে নেবে ? বাড়িঘর বাগান প্রায় সবই তো চন্দনার তবে পুতুলের মানা না মানায় কিইবা এসে যায় ।

ভরা পূর্ণিমার রাত। আলোর বন্যায় আকাশ পাড়ি দিচ্ছে চাঁদ। মাধুর্যে ভরে উঠেছে বন প্রকৃতি আর ঘুচিয়ে দিয়েছে রাতের কালো। সোনার থালার মতো চাঁদ বাঁশবাগান পাড়ি দিয়ে দূরের মাঠের পানে যাচ্ছে। এমনি কত রাতে রাজ এসে তাকে ক্ষণিক সান্নিধ্য দিয়ে গেছে। ফেলে যাওয়া বাকি রাত চন্দনা চোখের পানিতে ভেসেছে, সে খোঁজ রাজ কোনদিন রাখেনি। পুতুল জানে আজ চন্দনা ফিরছে। থমথমে মুখে ঘর -বার করছে আর স্বামীর ব্যস্ততা দেখছে।
বছর ঘুরে গেল তবু চন্দনার মন ঘরে টেকে না। সন্ধ্যা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ কিন্তু সে ঘাটেই বসে আছে । মুসল্লিরা ছুটে যাচ্ছেন মসজিদে, শাঁখ বাজিয়ে পুরোহিত ঘোষণা করছেন সন্ধ্যার আগমনী বার্তা । তুষের আগুনে বারুদ মাখা পাটখড়ি ঢুকিয়ে পুতুল চুলো জ্বালিয়েছে। বাচ্চাটা কেন জানি কাঁদছে। আজ কাকডাকা ভোরে রাজ সদরে গিয়েছে কলেজের কাজে। চন্দনা উঠলো। পেছনের বারান্দার দরজাটা খোলা বিকেল থেকে। বন্ধ করে ফিরে দাঁড়াবার আগেই দুই হাতের শক্ত বেষ্টনীতে বাঁধা পড়লো। নিকষ অন্ধকারে অভ্যস্ত হবার আগেই পুরুষ্ট ঠোঁটের স্পর্শ। চকিতেই চলে গেলো রাজ। ভরা পূ্র্ণিমার এই রাতে আজ কিছুতেই চন্দনার চোখে ঘুম নামবে না। এই জ্যোৎস্না বিলাসের জন্যেই রিয়াজ ভালোবেসে তার নাম দিয়েছে চন্দ্র আর সেই থেকে রিয়াজ হয়েছে চন্দনার রাজ ।

দুই ঘরের এই বাড়িতে অনেকদিন পর চন্দনা একা। পুতুল পাশের গ্রামে বাপের বাড়িতে গিয়েছে, চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে। রাত হয়ে গেছে আজ আর সে ফিরবে না। প্যাডেলে জোরে পা চালিয়ে রিয়াজ ফিরে এলো। ঘরের পেছনের জানালা খুলে দিয়ে চন্দনাকে ডাকলো, এসো দেখে যাও। জানালার পর্দা সরিয়ে দিতে খাটের উপর জোছনা গলে পড়লো। প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় উপহার আলোকিত জ্যোৎস্নারাত৷ ! আলোর বন্যা নিয়ে আকাশে আবির্ভূত হয়েছে সোনার থালার মতো চাঁদ। কি হলো চন্দ্রমুখী, বলে ঘুরে দাঁড়াতেই রিয়াজ দেখলো , কল্পলোকের পরীর মত রূপের পসরা মেলে আধ শোয়া চন্দনাকে।
আমার ঘরে এভাবেই জোছনা আসে আর সারা রাত আমাকে কাঁদায় —গলা ভারী হয়ে আসে চন্দনার।
আজ আর কোন মন খারাপ কথা নয় —

“রাতে যখন একলা শোবো —
চাইবে তোমায় বুক,
নিবিড়-ঘন হবে যখন একলা থাকার দুখ,
সুখের সুরায় মত্ত হয়ে
থাকবে এ প্রাণ তোমায় ল’য়ে
কল্পনাতে আঁকবো তোমার চাঁদ -চুয়ানো মুখ !
ঘুমে জাগায় জড়িয়ে রবে সেই তো চরম সুখ ।”

তুমি আমার গোপন প্রিয়া।তাই তো নজরুলের “গোপনপ্রিয়া” থেকে শোনালাম।
আমাকে তুমি চিরকাল এভাবেই গোপন করে রাখবে ? আমাদের পবিত্র সম্পর্কটা প্রকাশ্যে আনবে না কোনোদিন ?
এমন মধুর সময়ে কেন এসব টেনে আনছো
চন্দ্র ?
তাহলে আমার সারাদিনের চিন্তার বিষয় আমি কখন তোমাকে বলবো ? এর জন্য কখন সঠিক সময় বলো।
চন্দনাকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে রিয়াজ বললো, বোঝো না কেন ? আমার কি বলার মতো কোন কথা আছে ? অকুল সাগরে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি, কোন কূলকিনারা পাই না। আমাদের দুটো শরীর আত্মা তো একটা কিন্তু কি করবো বলো, আমি তো একা নই আরো দুজন আমার উপর নির্ভরশীল। ছেলেবেলা থেকে আমরা দুজন একসাথে বড়ো হয়েছি বলে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলছে না কিন্তু পুতুল যেদিন মুখ খুলবে তখন কি সুবিধাবাদীরা আমাকে ছেড়ে দেবে বলো ? তোমার এ বাড়িটার প্রতিও অনেকের লোভ।
আমার একটা কথা শুনবে ?
কি কথা বলো শুনি।
পুতুলকে সব বলে দাও ।
কী সব ?
এ-ই তোমার -আমার কথা ।
মোবাইলটা বেজে উঠলো এসময়। হাত বাড়িয়ে নিতে চাইলো রিয়াজ কিন্তু চিলের মতো ছোঁ মেরে পুতুল মোবাইলটা নিয়ে চিৎকার করে উঠলো, খুব সতী সাধ্বী ! বাল্যসখী ! চিৎকার করতে করতে রাজকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল । কিছুক্ষণ পর চন্দনা দেখলো রিয়াজ চুপচাপ বাড়ির বাইরে চলে যাচ্ছে ।

উদ্দেশ্যহীনভাবে বাজারে ঘুরলো কিছুক্ষণ রিয়াজ।কলেজপাড়ায় ভালো লাগলো না বেশিক্ষণ। সারাদিনে কয়েক কাপ চা ছাড়া কিছুই পেটে পড়েনি। ক্লান্তি আর অবসন্নতায় শরীর চলতে চাইছে না। বাড়ি ফিরতেও ইচ্ছে করছে না। শীতের স্থবির হয়ে আসা সাঁঝের অপরূপ প্রশান্তি চারদিকে। চোখ ধাঁধানো আলপনার তলায় বিলীন হয়ে যাওয়া হলুদ । ওপরে বনের মাথায় থরে থরে সাজানো রূপের পসরা । সাংসারিক যন্ত্রণাবিদ্ধ রিয়াজ— অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সারাদিনের বেদনাকাতর অনুভূতি পেছনে ফেলে সুখকর আনন্দস্মৃতি ভেসে ওঠে মনে। সকালে চন্দনা গাইছিলো—
হৃদয় যথায় প্রেম না শুকায়
সেই অমরায় মরে স্মরিও।।
বাড়ির পথে দ্রুত পা চালায় রিয়াজ ; যেখানে তার পদধ্বনি শোনার জন্য সারাদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে তার চন্দ্রমুখী।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD